এলপিজি গ্যাসের দাম ২০২৬: আজকের সর্বশেষ এলপিজি সিলিন্ডারের দাম, পরিবর্তনের কারণ ও আপডেট
বর্তমানে আধুনিক জীবনযাত্রার একটি অপরিহার্য উপাদান হলো এলপিজি বা লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস। বিশেষ করে বাংলাদেশের শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলেও রান্নার কাজে এলপিজি সিলিন্ডারের ব্যবহার আকাশচুম্বী। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার এবং ডলারের বিনিময় হারের অস্থিরতার কারণে এলপিজি গ্যাসের দাম সাধারণ মানুষের কাছে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকের এই বিস্তারিত প্রতিবেদনে আমরা ২০২৬ সালের সর্বশেষ এলপিজি সিলিন্ডারের দাম, দাম পরিবর্তনের নেপথ্যের কারণ এবং গ্রাহকদের জন্য প্রয়োজনীয় সকল আপডেট নিয়ে আলোচনা করব।
এলপিজি গ্যাসের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব
বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ সীমিত হয়ে আসায় সরকার বাসাবাড়িতে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ রেখেছে। এর ফলে বিকল্প হিসেবে এলপিজি সিলিন্ডার এখন কোটি মানুষের ভরসা। শুধু রান্নাই নয়, বর্তমানে অটোমোবাইল সেক্টরে অটোগ্যাস হিসেবে এবং ছোট-বড় শিল্পকারখানাতেও এলপিজি ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২৬ সালে এসে আমরা দেখছি যে, বাজারে ডজনখানেকেরও বেশি বেসরকারি কোম্পানি এলপিজি সরবরাহ করছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বসুন্ধরা এলপিজি, ওমেরা, বেক্সিমকো, যমুনা, ফ্রেশ, এবং টোটাল গ্যাস। বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবে দামের ওঠা-নামা গ্রাহকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে।
২০২৬ সালে এলপিজি গ্যাসের দাম নির্ধারণ পদ্ধতি
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC) প্রতি মাসের শুরুতে এলপিজি গ্যাসের নতুন দাম ঘোষণা করে। আগে কোম্পানিগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করত, কিন্তু এখন সরকারিভাবে একটি নির্দিষ্ট দাম বেঁধে দেওয়া হয়। ২০২৬ সালে এই প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা আনা হয়েছে। সৌদি আরামকোর কন্ট্রাক্ট প্রাইজ (CP) অনুযায়ী প্রোপেন এবং বিউটেনের গড় দাম হিসাব করে বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারে খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া আমদানি খরচ, এলসি মার্জিন, ডিলার কমিশন এবং পরিবহন খরচ এই দামের সাথে যুক্ত থাকে।
আজকের সর্বশেষ এলপিজি সিলিন্ডারের দামের তালিকা
নিচে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের জন্য নির্ধারিত এলপিজি গ্যাসের একটি আনুমানিক ও সর্বশেষ দামের তালিকা দেওয়া হলো। উল্লেখ্য যে, এলাকাভেদে এবং কোম্পানিভেদে খুচরা পর্যায়ে এই দাম কিছুটা কম-বেশি হতে পারে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ১২ কেজির সিলিন্ডারকে স্ট্যান্ডার্ড ধরে অন্যান্য ওজনের দাম নির্ধারণ করা হয়।
জানুয়ারি ২০২৬ মাসের জন্য এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য তালিকা
| সিলিন্ডারের ওজন (কেজি) | সরকারি নির্ধারিত মূল্য (টাকা) | খুচরা বাজারের সম্ভাব্য মূল্য (টাকা) |
| ৫.৫ কেজি সিলিন্ডার | ৬৫০ – ৭০০ | ৭২০ – ৭৫০ |
| ১২ কেজি সিলিন্ডার (স্ট্যান্ডার্ড) | ১,৪৫৫ – ১,৫১০ | ১,৫৫০ – ১,৬২০ |
| ১৫ কেজি সিলিন্ডার | ১,৮২০ – ১,৮৭০ | ১,৯০০ – ১,৯৫০ |
| ৩৫ কেজি সিলিন্ডার | ৪,২৫০ – ৪,৩৫০ | ৪,৪০০ – ৪,৫৫০ |
| ৪৫ কেজি সিলিন্ডার | ৫,৪৬০ – ৫,৬০০ | ৫,৭০০ – ৫,৯০০ |
| অটোগ্যাস (প্রতি লিটার) | ৬৬.৫০ – ৭০.০০ | ৭২.০০ – ৭৫.০০ |
এলপিজি গ্যাসের দাম পরিবর্তনের প্রধান কারণসমূহ
২০২৬ সালে এলপিজি গ্যাসের দাম কেন বারবার পরিবর্তিত হচ্ছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হলো:
১. সৌদি আরামকো কন্ট্রাক্ট প্রাইজ (Saudi CP): বাংলাদেশ তার এলপিজির চাহিদার সিংহভাগই আমদানি করে। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি আরামকো প্রতি মাসে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম ঘোষণা করে। এই দাম বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে। সৌদি আরামকো যদি দাম বাড়ায়, তবে বাংলাদেশেও এলপিজির দাম বেড়ে যায়।
২. ডলারের বিনিময় হার: এলপিজি আমদানির জন্য ব্যবসায়ীদের ডলারে এলসি (Letter of Credit) খুলতে হয়। ২০২৬ সালেও ডলারের বিপরীতে টাকার মান কিছুটা অস্থিতিশীল থাকায় এলসি খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ডলারের দাম এক টাকা বাড়লে সিলিন্ডার প্রতি দাম কয়েক টাকা বেড়ে যেতে পারে।
৩. আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি: মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো বৈশ্বিক সংকটগুলো জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায়। সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন বাধাগ্রস্ত হলে আমদানিকৃত গ্যাসের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে।
৪. পরিবহন ও জাহাজ ভাড়া: সমুদ্রপথে বড় জাহাজে করে এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে জাহাজ ভাড়া বা ফ্রেইট চার্জ একটি বড় ফ্যাক্টর। আন্তর্জাতিক রুটে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে জাহাজ ভাড়াও বাড়ে, যার প্রভাব পড়ে সাধারণ গ্রাহকের সিলিন্ডারের ওপর।
৫. স্থানীয় সরবরাহ ব্যবস্থা ও চাঁদাবাজি: অনেক সময় ডিলার বা রিটেইল পর্যায়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। এছাড়া দুর্গম এলাকায় পরিবহন খরচ বেশি হওয়ার অজুহাতে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা রাখা হয়।
বেসরকারি বনাম সরকারি এলপিজি সিলিন্ডার
বাংলাদেশে সরকারি কোম্পানি এলপি গ্যাস লিমিটেড (LPGL) তুলনামূলক অনেক কম দামে সিলিন্ডার সরবরাহ করে। সরকারি ১২.৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম সাধারণত ১০০০ টাকার নিচে থাকে। তবে সমস্যা হলো, সরকারি গ্যাসের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় মাত্র ২-৩ শতাংশ। ফলে সাধারণ মানুষ বেসরকারি কোম্পানিগুলোর ওপরই নির্ভরশীল। বেসরকারি কোম্পানিগুলোর রিফাইনারি খরচ এবং অপারেশনাল ব্যয় বেশি হওয়ায় তাদের দামও সরকারি সিলিন্ডারের তুলনায় বেশি হয়ে থাকে।
গ্রাহকদের জন্য কিছু জরুরি টিপস ও সুরক্ষা সতর্কতা
১. সিলিন্ডার কেনার সময় বিইআরসি (BERC) নির্ধারিত আজকের দাম দেখে নিন। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাবি করলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ জানান।
২. সিলিন্ডারের গায়ে লেখা মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ বা এক্সপায়ারি ডেট চেক করুন।
৩. সিলিন্ডারের ক্যাপ বা সীল অক্ষত আছে কি না তা যাচাই করে নিন।
৪. রান্নার সময় গ্যাসের গন্ধ পেলে দ্রুত জানলা খুলে দিন এবং সিলিন্ডারের নব বন্ধ করুন। কখনই দিয়াশলাই বা বৈদ্যুতিক সুইচ অন করবেন না।
ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস: ২০২৬ এর বাকি সময়ে দাম কেমন হতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ববাজারে এলপিজির চাহিদা কিছুটা কমতে পারে, যার ফলে দাম হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করবে ওপেকের (OPEC) সিদ্ধান্ত এবং বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপর। সরকার যদি এলপিজি আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেয়, তবে সাধারণ মানুষ আরও কম দামে গ্যাস ব্যবহারের সুবিধা পাবে।
FAQs
Q: ২০২৬ সালে বর্তমানে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম কত?
বর্তমানে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত দাম ১৪৫৫ থেকে ১৫১০ টাকার মধ্যে, তবে খুচরা বাজারে এটি ১৫৫০ থেকে ১৬২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
Q: এলপিজি গ্যাসের দাম কি প্রতি মাসে পরিবর্তিত হয়?
হ্যাঁ, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC) আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে মিল রেখে প্রতি মাসের শুরুতে নতুন দাম ঘোষণা করে।
Q: কেন বিভিন্ন দোকানে একই সিলিন্ডারের দাম ভিন্ন হয়?
মূলত এলাকাভিত্তিক পরিবহন খরচ এবং ডিলারদের লাভের মার্জিনের ভিন্নতার কারণে খুচরা বাজারে দামের কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়।
Q: অটোগ্যাস এবং রান্নার এলপিজি কি একই?
রাসায়নিকভাবে দুটিই এলপিজি, তবে অটোগ্যাস যানবাহনে ব্যবহারের জন্য লিটার হিসেবে এবং রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারে কেজি হিসেবে বিক্রি হয়।
Q: সিলিন্ডার কেনার সময় বেশি দাম চাইলে কোথায় অভিযোগ করব?
সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম চাইলে আপনি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হটলাইন নম্বর ১৬১২১-এ কল করে অভিযোগ করতে পারেন।
Q: সরকারি এলপিজি সিলিন্ডার কেন সহজে পাওয়া যায় না?
সরকারি এলপিজির উৎপাদন ও মজুদ ক্ষমতা সীমিত। এটি মোট চাহিদার খুব সামান্য অংশ পূরণ করতে পারে বলে সাধারণ বাজারে এর সংকট থাকে।
Q: ২০২৬ সালে এলপিজি গ্যাসের দাম কি কমার সম্ভাবনা আছে?
বিশ্ববাজারে সৌদি আরামকোর দাম কমলে এবং ডলারের বাজার স্থিতিশীল থাকলে দাম কমার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালে এলপিজি গ্যাস শুধু একটি জ্বালানি নয়, এটি গৃহিণীদের জীবনের স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতীক। তবে দামের ঘন ঘন পরিবর্তন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের বাজেটে চাপ সৃষ্টি করছে। সরকারের উচিত নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা এবং ডিলার পর্যায়ে নির্ধারিত দাম বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। গ্রাহক হিসেবে আমাদেরও সচেতন হতে হবে এবং ন্যায্য মূল্যের দাবিতে সোচ্চার থাকতে হবে। আজকের সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, দাম কিছুটা বাড়তি থাকলেও সামনের মাসগুলোতে বাজার স্থিতিশীল হবে বলে আশা করা যায়। নিয়মিত দামের আপডেট পেতে বিশ্বস্ত নিউজ পোর্টাল এবং বিইআরসির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের দিকে নজর রাখুন।






