ইলিশ মাছের দাম ২০২৬: সাইজ অনুযায়ী বর্তমান বাজার দর তালিকা
ইলিশ মাছ, বাঙালির জাতীয় মাছ এবং ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। পাতে ইলিশের উপস্থিতি মানেই ভোজ উৎসবে এক বিশেষ মাত্রা। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে বাজারে ইলিশের দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। উৎপাদন বাড়ার সরকারি তথ্য থাকলেও, সাধারণ মানুষের জন্য ইলিশ এখন এক মহার্ঘ্য বস্তু। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন কমে গিয়েছিল কিছুটা, যা দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ২০২৬ সালে ইলিশ মাছের বাজার দর কেমন হবে, তা নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের মধ্যেই রয়েছে নানা প্রশ্ন। এই প্রবন্ধে আমরা ২০২৬ সালের ইলিশ মাছের সম্ভাব্য বাজার দর এবং দামের তারতম্যের কারণগুলো সাইজ অনুযায়ী বিশ্লেষণ করব।
ইলিশের দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণসমূহ
ইলিশের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু কারণ জড়িত, যা শুধুমাত্র সরবরাহ বা চাহিদা নয়, বরং একটি জটিল বাজার ব্যবস্থার ফল। এর মধ্যে রয়েছে:
- চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতা: যদিও সরকারি তথ্যমতে ইলিশ উৎপাদন বেড়েছে, তবে বাস্তবে নদী ও সাগরে ইলিশের সংখ্যা কমেছে বলে অনেক জেলে ও ব্যবসায়ী মনে করেন। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় দাম বাড়ছে।
- মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য: ইলিশ মাছ জেলেদের হাত থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত অন্তত চার থেকে ছয়বার হাতবদল হয়। প্রতিটি ধাপে দাম প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
- জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়: মাছ ধরার ট্রলারের জ্বালানি তেল, নৌকা ও জালের দাম এবং পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০৫ সালের তুলনায় বর্তমানে মাছ ধরতে যাওয়ার খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা সরাসরি মাছের দামে প্রভাব ফেলে।
- নদীর নাব্যতা সংকট ও পরিবেশগত কারণ: নদী দূষণ, পলি জমাট বাঁধা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাঁধ নির্মাণের ফলে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে। ইলিশের পরিযায়ী পথ পরিবর্তন হওয়ায় নদীতে মাছ কম ধরা পড়ছে।
- অবৈধ জালের ব্যবহার: জাটকা নিধন এবং কারেন্ট জালের অবৈধ ব্যবহার ইলিশের প্রজনন ও বংশবিস্তারে বাধা দিচ্ছে।
- মজুদ ও সিন্ডিকেট: একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে ইলিশ মাছ কোল্ড স্টোরেজে মজুদ করে রাখে এবং পরে চড়া দামে বিক্রি করে।
সাইজ অনুযায়ী বর্তমান বাজার দর (২০২৫ সালের শেষ ও ২০২৬ সালের শুরু)

ইলিশ মাছের দাম মূলত তার আকার (ওজন), উৎস (নদী বা সাগর), এবং মৌসুমের ওপর নির্ভর করে। সাধারণত নদীর ইলিশ, বিশেষ করে পদ্মা ও মেঘনার ইলিশের চাহিদা ও দাম সবচেয়ে বেশি থাকে। ২০২৫ সালের শেষ এবং ২০২৬ সালের শুরুর দিকে (শীত মৌসুম) বাজারে ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় দাম বেশ চড়া ছিল।
এই সময়ে বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ইলিশের দাম প্রতি কেজি ৮০০ টাকা থেকে শুরু করে ৩,৫০০ টাকা বা তার বেশিও হতে পারে। ১ কেজির বেশি ওজনের মাছের দাম সবচেয়ে বেশি থাকে।
ইলিশ মাছের আনুমানিক বাজার দর (২০২৬)

নিচের তালিকাটি ডিসেম্বর ২০২৫ এবং জানুয়ারী ২০২৬ সালের বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন সাইজের ইলিশ মাছের একটি আনুমানিক মূল্য তালিকা। এই দামগুলো বাজার ও বিক্রেতাভেদে কিছুটা তারতম্য হতে পারে।
| মাছের সাইজ (ওজন) | আনুমানিক মূল্য (প্রতি কেজি) |
| ৩০০ – ৪০০ গ্রাম | ৳ ৮০০ – ৳ ১,০০০ |
| ৪৫০ – ৬৫০ গ্রাম | ৳ ১,৪০০ – ৳ ১,৮০০ |
| ৭০০ – ৮০০ গ্রাম | ৳ ১,৮০০ – ৳ ২,২০০ |
| ৯০০ গ্রাম – ১ কেজি | ৳ ২,২০০ – ৳ ২,৭০০ |
| ১ কেজি – ১.২ কেজি | ৳ ২,৭০০ – ৳ ৩,১০০ |
| ১.৩ কেজি – ১.৫ কেজি | ৳ ৩,২০০ – ৳ ৪,৫০০+ |
| ১.৫ কেজির বেশি (বড় সাইজ) | ৳ ৪,০০০ – ৳ ৬,০০০+ |
এই দামগুলো মূলত ঢাকা শহরের খুচরা বাজার এবং অনলাইন শপগুলোর তথ্য থেকে সংগৃহীত। চাঁদপুরের মতো মোকামগুলোতে দাম কিছুটা কম হতে পারে। তবে বড় ইলিশ মাছ বাজারে খুব কম পাওয়া যায়।
দাম কি আরও বাড়বে?
২০২৬ সালে ইলিশের দাম আরও বাড়বে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রবণতা এবং চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় দাম কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বরং পরিবেশগত নানা সমস্যার সমাধান না হলে দাম আরও বাড়তে পারে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন সুপারিশ করেছিল খুচরা মূল্য বেঁধে দেওয়ার জন্য, কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। তবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে পালন এবং জাটকা সংরক্ষণ সম্ভব হলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন বাড়তে পারে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

মৎস্য অধিদপ্তর এবং গবেষকরা মনে করছেন, ইলিশ সংরক্ষণে সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি, যেমন প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা এবং জাটকা নিধন বন্ধের অভিযান ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। এই পদক্ষেপগুলো যদি কঠোরভাবে মেনে চলা হয়, তবে হয়তো আগামীতে ইলিশের সরবরাহ বাড়বে এবং দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে। নদী ও সমুদ্রের পরিবেশগত উন্নয়ন এবং দূষণ রোধ করাও জরুরি।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
Q: ইলিশ মাছের দাম কি সারা বছর একই থাকে?
A.w: না, ইলিশের দাম মৌসুম অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। সাধারণত ইলিশের প্রধান মৌসুম জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত থাকে, যখন দাম কিছুটা কম থাকে। শীতকালে সরবরাহ কমলে দাম বাড়ে।
Q: পদ্মা ও সাগরের ইলিশের দামের মধ্যে পার্থক্য কেন?
A.w: পদ্মা ও মেঘনা নদীর ইলিশের স্বাদ ও গন্ধ সাগরের ইলিশের চেয়ে ভালো বলে মনে করা হয়। একারণে নদীর ইলিশের চাহিদা ও দাম সাগরের ইলিশের চেয়ে বেশি হয়。
Q: ১ কেজি ওজনের ইলিশ মাছের বর্তমান বাজার মূল্য কত?
A.w: ডিসেম্বর ২০২৫ এর বাজার অনুযায়ী, ১ কেজি ওজনের ইলিশ মাছের দাম সাধারণত ৳ ২,২০০ থেকে ৳ ২,৭০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে, যা বাজারের অবস্থান ভেদে ভিন্ন হয়।
Q: জাটকা কী এবং এটি কেন ধরা নিষেধ?
A.w: জাটকা হলো ছোট ইলিশ মাছ (সাধারণত ২৩ সেন্টিমিটারের নিচে)। জাটকা ধরলে ইলিশের বংশবিস্তার ব্যাহত হয়, তাই সরকার একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জাটকা ধরা, বিক্রি বা পরিবহন নিষিদ্ধ করেছে।
Q: ইলিশ মাছের দাম কমাতে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
A.w: সরকার ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করে, জাটকা নিধন রোধে অভিযান চালায় এবং ইলিশ সংরক্ষণে বিভিন্ন আইন প্রয়োগ করে। এছাড়া কৃত্রিম সংকট রোধে বাজার মনিটরিং করার চেষ্টা করা হয়।
Q: ইলিশের দাম বাড়ার পেছনে কি সিন্ডিকেট জড়িত?
A.w: হ্যাঁ, অনেক ভোক্তা এবং বাজার বিশ্লেষক মনে করেন যে একশ্রেণির ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দেয়।
Q: ভবিষ্যতে কি ইলিশ মাছ চাষ করা সম্ভব হবে?
A.w: ইলিশ মাছ একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং পরিযায়ী প্রজাতির মাছ। এর জটিল প্রজনন আচরণের কারণে এখনও বাণিজ্যিকভাবে ইলিশ মাছের চাষ সম্ভব হয়নি।
উপসংহার
২০২৬ সালে ইলিশ মাছের দাম সাধারণ মানুষের জন্য একটি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরবরাহ ঘাটতি, উচ্চ মাছ ধরার খরচ, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং সর্বোপরি জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের মতো কারণগুলো দামকে ঊর্ধ্বমুখী করে রেখেছে। যদিও ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি প্রচেষ্টা চলছে, তবে এই সমস্যাগুলো সমাধান না হলে ইলিশ মাছ আগামীতেও অধিকাংশ বাঙালির পাতে মহার্ঘ্য হয়েই থাকবে। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমেই কেবল ইলিশের প্রাচুর্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব, যা দাম কমাতেও সাহায্য করবে।






