পেঁয়াজের দাম

পেঁয়াজের দাম আজ কত? সর্বশেষ বাজারদর আপডেট ২০২৬

বাঙালি রান্নার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো পেঁয়াজ। মাছের ঝোল হোক বা মাংসের কষা, কিংবা সান্ধ্যকালীন নাস্তায় মুচমুচে পিয়াজু—সবখানেই এর আধিপত্য। তবে সাধারণ মানুষের কাছে পেঁয়াজ কেবল একটি মসলা নয়, বরং বাজারের অস্থিরতার এক বড় প্রতীক। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পেঁয়াজের দামের উঠানামা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের দুশ্চিন্তার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকের এই বিস্তারিত প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব ২০২৬ সালের বর্তমান সময়ে পেঁয়াজের বাজার পরিস্থিতি, দেশি ও আমদানিকৃত পেঁয়াজের দামের পার্থক্য এবং সামনের দিনগুলোতে দাম কমার কোনো সম্ভাবনা আছে কি না।

পেঁয়াজের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি: একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ

২০২৬ সালের শুরু থেকেই পেঁয়াজের বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাধারণত শীতের শেষের দিকে নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসতে শুরু করলে দাম কিছুটা কমে আসে। তবে এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং পরিবহন খরচের কারণে বাজারে এর প্রভাব পড়েছে ভিন্নভাবে। ঢাকার কারওয়ান বাজার, শ্যামবাজার এবং স্থানীয় খুচরা বাজারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারি ও খুচরা মূল্যের মধ্যে বেশ বড় ব্যবধান বিদ্যমান। পাইকারি বাজারে যে পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৮০-৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, খুচরা বাজারে সাধারণ ক্রেতাকে তা কিনতে হচ্ছে ১০০-১১০ টাকায়। এই বাড়তি দামের পেছনে সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি সিন্ডিকেটের কারসাজিকেও দায়ী করছেন অনেক সচেতন ভোক্তা

দেশি বনাম আমদানিকৃত পেঁয়াজ: স্বাদে ও দামে পার্থক্য

বাংলাদেশের মানুষের কাছে দেশি পেঁয়াজের চাহিদা সবসময়ই তুঙ্গে। এর তীব্র ঘ্রাণ এবং রান্নায় বিশেষ স্বাদের জন্য মানুষ বাড়তি টাকা দিয়েও দেশি পেঁয়াজ কিনতে পছন্দ করেন। তবে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন পর্যাপ্ত না হওয়ায় আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, তুরস্ক, মিশর এবং পাকিস্তান থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। বর্তমানে বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজের সরবরাহ থাকলেও তার দামও গত বছরের তুলনায় কিছুটা চড়া। তুরস্ক বা মিশর থেকে আসা বড় সাইজের পেঁয়াজগুলো সাধারণত হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে বেশি ব্যবহৃত হয়, কারণ এগুলোর দাম দেশি পেঁয়াজের তুলনায় কিছুটা কম থাকে।

কেন বাড়ছে পেঁয়াজের দাম? মূল কারণসমূহ

পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির পেছনে কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণ কাজ করে না। বরং এটি অনেকগুলো উপাদানের সমষ্টি। প্রথমত, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে ট্রাক ভাড়া বা পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গ্রাম থেকে শহরে পেঁয়াজ পৌঁছাতেই প্রতি কেজিতে ৫-৮ টাকা খরচ বেড়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে পেঁয়াজের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অসময়ে বৃষ্টি বা অতি তাপমাত্রার কারণে অনেক কৃষকের মজুদ করা পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে মুদ্রাস্ফীতি এবং ডলার সংকটের কারণে আমদানিকৃত পেঁয়াজের এলসি (LC) খুলতে জটিলতা দেখা দিচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের পকেটে।

আজকের পেঁয়াজের বাজারদর তালিকা ২০২৬

নিচে আজকের বাজারের সর্বশেষ পাইকারি ও খুচরা দরের একটি তুলনামূলক ছক দেওয়া হলো। এই তথ্যগুলো বাজারের বর্তমান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, তবে স্থানভেদে ৫-১০ টাকা কমবেশি হতে পারে।

পেঁয়াজের ধরনপাইকারি দাম (প্রতি কেজি)খুচরা বাজারদর (প্রতি কেজি)মান/কোয়ালিটি
দেশি নতুন পেঁয়াজ৮০ – ৮৫ টাকা৯৫ – ১০৫ টাকাপ্রিমিয়াম
দেশি পুরোনো পেঁয়াজ৯০ – ৯৫ টাকা১০৫ – ১১৫ টাকাশুকনা ও ঝরঝরে
ভারতীয় পেঁয়াজ (নাসিক)৭০ – ৭৫ টাকা৮৫ – ৯০ টাকাবড় ও লালচে
পাকিস্তানি পেঁয়াজ৬৫ – ৬৮ টাকা৮০ – ৮৫ টাকামাঝারি সাইজ
মিশরীয়/তুর্কি পেঁয়াজ৬০ – ৬৫ টাকা৭৫ – ৮০ টাকাআকারে অনেক বড়
লাল পেঁয়াজ (দেশি)৮২ – ৮৮ টাকা৯৮ – ১০৮ টাকাঘরোয়া ব্যবহারের উপযোগী

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও বাজার মনিটরিং

বাজারের এই অস্বাভাবিক দাম নিয়ন্ত্রণে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। বিভিন্ন সময় আড়তদারদের গুদামে তল্লাশি চালানো হচ্ছে যাতে কেউ অবৈধভাবে পেঁয়াজ মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে। তবে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, এই অভিযানগুলো কেবল সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে দাম কমাতে খুব একটা কার্যকর হচ্ছে না। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, স্থায়ী সমাধান পেতে হলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মজুতদারদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

পেঁয়াজ সংরক্ষণে কৃষকের চ্যালেঞ্জ ও আধুনিক পদ্ধতি

বাংলাদেশে পেঁয়াজ চাষিরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন ফসল ঘরে তোলার পর তা সংরক্ষণ নিয়ে। হিমাগারের অভাব এবং সঠিক প্রযুক্তির অভাবে প্রতি বছর উত্তোলিত পেঁয়াজের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ পচে নষ্ট হয়ে যায়। সরকার যদি আধুনিক সাইলো বা বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারে, তবে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমে আসবে। ২০২৬ সালে অনেক এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ‘এয়ার ফ্লো’ সিস্টেমের গুদাম তৈরি করা হয়েছে, যা আশার আলো দেখাচ্ছে।

শীতকালীন সবজি ও পেঁয়াজের দামের সম্পর্ক

শীতের মৌসুমে বাজারে পেঁয়াজের পাতা বা কলি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। অনেকে মূল পেঁয়াজের বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহার করেন। ফলে এই সময়টাতে মূল পেঁয়াজের চাহিদায় কিছুটা ভাটা পড়ে। কিন্তু শীত শেষ হওয়ার সাথে সাথেই যখন পেঁয়াজ পাতার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তখন পুনরায় পেঁয়াজের ওপর চাপ তৈরি হয়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবে আশার কথা হলো, মার্চ-এপ্রিল নাগাদ যখন দেশের প্রধান ফসলি পেঁয়াজ বাজারে আসবে, তখন দাম কেজি প্রতি ৫০-৬০ টাকার ঘরে নেমে আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

অনলাইন বাজারে পেঁয়াজের দাম: সুবিধা ও অসুবিধা

ডিজিটাল বাংলাদেশে এখন ঘরে বসেই চাল-ডাল-পেঁয়াজ কেনা সম্ভব। চালডাল, ই-ফুড বা বিভিন্ন গ্রোসারি অ্যাপে পেঁয়াজের দাম বাজারের তুলনায় ৫-১০ টাকা বেশি হলেও হোম ডেলিভারি সুবিধার কারণে অনেকে এদিকে ঝুঁকছেন। অনলাইনে কেনাকাটার ক্ষেত্রে সুবিধা হলো, আপনি সহজেই বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের দাম তুলনা করতে পারেন। তবে অসুবিধার দিকটি হলো, সশরীরে দেখে ভালো মানের বা পচামুক্ত পেঁয়াজ বেছে নেওয়ার সুযোগ এখানে কম থাকে। অনেক সময় প্রিমিয়াম দাম দিয়েও নিম্নমানের পেঁয়াজ পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়।

ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস: ২০২৬ সালের শেষার্ধে পেঁয়াজের দাম কেমন থাকবে?

পেঁয়াজের দাম

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর পেঁয়াজের আবাদি জমির পরিমাণ গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। যদি পরবর্তী কয়েক মাস আবহাওয়া অনুকূলে থাকে, তবে ফলন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে মধ্য-২০২৬ এর দিকে পেঁয়াজের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের রপ্তানি নীতির ওপরও বাংলাদেশের বাজার অনেকখানি নির্ভর করে। ভারত যদি রপ্তানি বন্ধ বা ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য (MEP) বাড়িয়ে দেয়, তবে স্থানীয় বাজারে পুনরায় অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

গৃহিণীদের জন্য পেঁয়াজ সাশ্রয়ের কিছু টিপস

দামের এই উর্ধ্বগতির সময়ে রান্নাঘরে পেঁয়াজের ব্যবহার কিছুটা কমিয়ে আনলে মাসের বাজেটে সাশ্রয় সম্ভব। পেঁয়াজ কুচি করে কাটার পরিবর্তে ব্লেন্ড করে পেস্ট হিসেবে ব্যবহার করলে অল্প পরিমাণেই ঘন ঝোল পাওয়া যায়। এছাড়া পেঁয়াজ বেরেস্তা করে কাঁচের বয়ামে ভরে রাখলে তা অনেক দিন ভালো থাকে এবং রান্নার সময় অপচয় কম হয়। বাজারে যখন দাম কম থাকে, তখন বেশি করে কিনে শুকনা ও বাতাস চলাচল করে এমন স্থানে ছড়িয়ে রাখলে অন্তত ৩-৪ মাস নিশ্চিন্ত থাকা যায়।

পেঁয়াজ আমদানিতে নতুন উৎসের সন্ধান

ভারত থেকে আমদানিতে বারবার ঝক্কি সামলাতে সরকার এখন মিয়ানমার, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করছে। এর ফলে কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভরতা কমবে। ২০২৬ সালে ভিয়েতনাম থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানির চুক্তি হয়েছে, যার ফলে বাজারে প্রতিযোগীতা বাড়বে এবং সাধারণ ক্রেতারা তুলনামূলক কম দামে পণ্যটি পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

উপসংহার

পেঁয়াজ শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়, এটি এখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। “পেঁয়াজের দাম আজ কত?”—এই প্রশ্নটি প্রতিটি সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের দুশ্চিন্তার প্রতিফলন। উৎপাদন বৃদ্ধি, সংরক্ষণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং বাজার মনিটরিং জোরদার করার মাধ্যমেই এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান সম্ভব। আশা করা যায়, সরকারের সময়োচিত পদক্ষেপ এবং অনুকূল আবহাওয়ার সহায়তায় ২০২৬ সালের বাকি সময়গুলোতে পেঁয়াজের দাম মধ্যবিত্তের নাগালে থাকবে।

FAQs

Q: আজ দেশি পেঁয়াজের খুচরা দাম কত?

আজকের বাজার অনুযায়ী ভালো মানের দেশি পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৯৫ থেকে ১১০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।

Q: পেঁয়াজের দাম কি আগামী সপ্তাহে কমতে পারে?

নতুন পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়লে দাম কমতে পারে, তবে পরিবহন ধর্মঘট বা বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে দাম স্থিতিশীল থাকতে পারে বা বাড়তে পারে।

Q: সবচেয়ে কম দামে কোন পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে?

বর্তমানে আমদানিকৃত তুর্কি এবং মিশরীয় বড় পেঁয়াজ সবচেয়ে কম দামে (৭৫-৮০ টাকা) পাওয়া যাচ্ছে।

Q: ঢাকার বাইরে গ্রামের বাজারে পেঁয়াজের দাম কেমন?

ঢাকার তুলনায় উৎপাদনকারী এলাকাগুলোতে পেঁয়াজের দাম কেজি প্রতি ১০-১৫ টাকা কম হয়ে থাকে।

Q: পেঁয়াজ কেন দ্রুত পচে যাচ্ছে?

অসময়ে বৃষ্টি এবং আদ্রতা বেশি থাকার কারণে পেঁয়াজের গায়ে ছত্রাক জন্মে, ফলে তা দ্রুত পচনশীল হয়ে পড়ে।

Q: ভারতীয় পেঁয়াজ কি এখন বাজারে আছে?

হ্যাঁ, বাজারে বর্তমানে ভারতীয় নাসিক ও অন্যান্য জাতের পেঁয়াজ পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে।

Q: অনলাইনে কি পেঁয়াজ কেনা সাশ্রয়ী?

সময় বাঁচাতে অনলাইন ভালো মাধ্যম হলেও, ডেলিভারি চার্জ যোগ করলে খুচরা বাজারের তুলনায় খরচ কিছুটা বেশিই পড়ে।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *