ফ্যামিলি কার্ড আবেদন ২০২৬ | অনলাইন আবেদন পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও স্ট্যাটাস চেক
বাংলাদেশে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকারি সহায়তার অন্যতম একটি মাধ্যম হচ্ছে টিসিবি (TCB) ফ্যামিলি কার্ড। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন সরকার এই কার্ডের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে চাল, ডাল, তেল ও চিনি সরবরাহ করে। ২০২৬ সালে এই কার্ডের আবেদন প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু পরিবর্তন এবং ডিজিটাল পদ্ধতির আধুনিকায়ন করা হয়েছে। আজকের এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা জানবো কীভাবে আপনি ঘরে বসে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য আবেদন করবেন, কী কী কাগজ লাগবে এবং আবেদনের বর্তমান অবস্থা কীভাবে যাচাই করবেন।
ফ্যামিলি কার্ড বা টিসিবি কার্ড কী?
ফ্যামিলি কার্ড হলো মূলত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (TCB) কর্তৃক প্রদত্ত একটি সুবিধা। এই কার্ডের মাধ্যমে একটি পরিবার প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভোজ্য তেল, মসুর ডাল, চিনি এবং ক্ষেত্রবিশেষে চাল ও পেঁয়াজ বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে কিনতে পারে। ২০২৬ সালের নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, এখন থেকে এই কার্ডের কার্যক্রম আরও বেশি স্বচ্ছ করার জন্য ডিজিটাল ডাটাবেজ ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে প্রকৃত দুস্থ ও অসহায় মানুষ যেন এই সুবিধা পায়, তা নিশ্চিত করা সহজ হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ডের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব
বর্তমান বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে নিত্যপণ্যের দাম প্রায়ই ওঠানামা করে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য প্রতি মাসে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফ্যামিলি কার্ড থাকলে একজন ব্যক্তি বাজার দরের চেয়ে প্রায় ৩০% থেকে ৪০% কম দামে পণ্য কিনতে পারেন। এটি শুধুমাত্র একটি কার্ড নয়, বরং সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার একটি বড় হাতিয়ার। ২০২৬ সালে সরকার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে প্রায় ১ কোটি পরিবারকে এই সুবিধার আওতায় আনার।
ফ্যামিলি কার্ড আবেদনের যোগ্যতা
সবাই এই কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারবেন না। সরকার নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে:
১. আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের স্থায়ী নাগরিক হতে হবে।
২. পরিবারের মাসিক আয় নির্দিষ্ট সীমার নিচে হতে হবে (সাধারণত নিম্নবিত্ত ও অতিদরিদ্ররা অগ্রাধিকার পাবেন)।
৩. পরিবারের কোনো সদস্য সরকারি চাকরিজীবী হলে এই সুবিধা পাবেন না।
৪. এক পরিবার থেকে কেবল একজনই আবেদন করতে পারবেন।
৫. বিধবা, স্বামী নিগৃহীতা বা শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিরা বিশেষ অগ্রাধিকার পাবেন।
আবেদন করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
অনলাইনে বা অফলাইনে আবেদন করার আগে আপনাকে নির্দিষ্ট কিছু ডকুমেন্ট গুছিয়ে রাখতে হবে। ভুল তথ্য দিলে আবেদন বাতিল হয়ে যেতে পারে। নিচে প্রয়োজনীয় কাগজের তালিকা দেওয়া হলো:
প্রয়োজনীয় তথ্যের তালিকা
| ক্রমিক নং | কাগজপত্রের নাম | বিবরণ |
| ০১ | জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) | আবেদনকারীর অরিজিনাল এনআইডি কার্ডের কপি |
| ০২ | রঙিন ছবি | সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজের ২ কপি ছবি |
| ০৩ | মোবাইল নম্বর | সচল একটি সিম কার্ড যা এনআইডি দিয়ে কেনা |
| ০৪ | জন্ম নিবন্ধন সনদ | এনআইডি না থাকলে ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন (শর্তসাপেক্ষ) |
| ০৫ | নাগরিকত্ব সনদ | সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ বা কাউন্সিলর অফিস থেকে প্রাপ্ত |
| ০৬ | বিদ্যুৎ বিলের কপি | বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে (প্রয়োজন হতে পারে) |
| ০৭ | পরিবারের সদস্য তালিকা | পরিবারের সকল সদস্যের নাম ও এনআইডি নম্বর |
অনলাইন আবেদন পদ্ধতি ২০২৬
২০২৬ সালে ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা হয়েছে। এখন আর লাইনে দাঁড়িয়ে ফরম জমা দেওয়ার ঝামেলা নেই। আপনি চাইলে স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ ব্যবহার করে নিজেই আবেদন করতে পারেন।
ধাপ ১: অফিসিয়াল পোর্টালে প্রবেশ
প্রথমে আপনাকে টিসিবির নির্ধারিত ওয়েবসাইট TCB Sheba Portal (tcbsheba.com) অথবা আপনার স্থানীয় সরকার বিভাগের ডিজিটাল সার্ভিস পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে।
ধাপ ২: রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন
পোর্টালে যাওয়ার পর ‘নতুন আবেদন’ বাটনে ক্লিক করুন। সেখানে আপনার সচল মোবাইল নম্বরটি দিন। আপনার মোবাইলে একটি ওটিপি (OTP) কোড আসবে, সেটি ভেরিফাই করে পরবর্তী ধাপে যান।
ধাপ ৩: ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান
এখানে আপনার এনআইডি কার্ড অনুযায়ী নাম, পিতার নাম, মাতার নাম এবং জন্ম তারিখ নির্ভুলভাবে লিখতে হবে। মনে রাখবেন, এনআইডির তথ্যের সাথে মিল না থাকলে সফটওয়্যার অটোমেটিক আপনার আবেদন রিজেক্ট করে দেবে।
ধাপ ৪: ঠিকানা ও পেশা নির্বাচন
আপনার বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা সঠিকভাবে দিন। আপনি কী কাজ করেন এবং আপনার পরিবারের মাসিক আয় কত তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন। এখানে কোনো তথ্য গোপন করবেন না, কারণ পরবর্তীতে মাঠ পর্যায়ে এটি যাচাই করা হয়।
ধাপ ৫: ছবি ও সিগনেচার আপলোড
আপনার স্মার্টফোন দিয়ে তোলা একটি পরিষ্কার ছবি এবং সাদা কাগজে আপনার স্বাক্ষর করে সেটি স্ক্যান করে আপলোড করুন। ফাইলের সাইজ যেন নির্দিষ্ট সীমার (সাধারণত ১০০ কেবি) বেশি না হয়।
ধাপ ৬: আবেদন সাবমিট
সব তথ্য চেক করে ‘Submit’ বাটনে ক্লিক করুন। সফলভাবে আবেদন সম্পন্ন হলে আপনি একটি আবেদন আইডি (Application ID) পাবেন। এটি প্রিন্ট করে বা স্ক্রিনশট নিয়ে সংরক্ষণ করুন।
অফলাইন আবেদন পদ্ধতি
যারা ইন্টারনেট ব্যবহারে দক্ষ নন, তাদের জন্য অফলাইন পদ্ধতিও সচল আছে। আপনি আপনার নিকটস্থ ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়, পৌরসভা অফিস অথবা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। সেখান থেকে সরকার নির্ধারিত ফরম সংগ্রহ করে পূরণ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ জমা দিলে তারা আপনার হয়ে ডাটা এন্ট্রি করে দেবে।
আবেদন পরবর্তী যাচাই বাছাই প্রক্রিয়া
আবেদন করার মানেই এই নয় যে আপনি কার্ড পাবেন। আপনার দেওয়া তথ্যগুলো স্থানীয় প্রশাসনের (ইউএনও অফিস বা টাস্কফোর্স) মাধ্যমে যাচাই করা হবে। যদি দেখা যায় আপনি সত্যিই এই কার্ডের যোগ্য, তবেই আপনার নামে কার্ড ইস্যু করা হবে। সাধারণত আবেদন করার ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শেষ হয়।
ফ্যামিলি কার্ড স্ট্যাটাস চেক করবেন কীভাবে?
আবেদন করার পর আপনার কার্ডটি অনুমোদিত হয়েছে কি না তা জানতে মাঝেমধ্যেই স্ট্যাটাস চেক করা জরুরি।
১. সরাসরি TCB Status Check Link-এ ক্লিক করুন।
২. আপনার আবেদন আইডি অথবা এনআইডি নম্বর প্রদান করুন।
৩. আপনার জন্ম তারিখ লিখে সার্চ বাটনে ক্লিক করুন।
এখানে আপনি দেখতে পাবেন আপনার আবেদনটি ‘Pending’, ‘Approved’ নাকি ‘Rejected’ অবস্থায় আছে।
কার্ড পাওয়ার পর পণ্য সংগ্রহের নিয়ম
ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার পর আপনাকে নির্দিষ্ট একজন ডিলারের সাথে ট্যাগ করে দেওয়া হবে। প্রতি মাসে টিসিবি থেকে পণ্য বিতরণের তারিখ ঘোষণা করা হলে আপনার মোবাইলে এসএমএস আসতে পারে অথবা স্থানীয়ভাবে মাইকিং করা হবে। কার্ড নিয়ে নির্ধারিত স্থানে গিয়ে সরকার নির্ধারিত দামে পণ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। পণ্য নেওয়ার সময় অবশ্যই কার্ডটি সাথে রাখতে হবে।
২০২৬ সালের নতুন সুবিধা ও ডিজিটাল পোর্টাল
২০২৬ সালে সরকার ফ্যামিলি কার্ডকে স্মার্ট কার্ডে রূপান্তর করার পরিকল্পনা করেছে। এর ফলে ওজনে কম দেওয়া বা পণ্য আত্মসাতের সুযোগ থাকবে না। ডিজিটাল সেবার জন্য নিচের অ্যাপ ও ওয়েবসাইটগুলো নিয়মিত অনুসরণ করুন:
- টিসিবি অফিসিয়াল ওয়েবসাইট: tcb.gov.bd – এখানে টিসিবির সকল আপডেট এবং নোটিশ পাওয়া যায়।
- স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড সেবা (অনলাইন পোর্টাল): tcbsheba.com – এই পোর্টালে ঢুকে আপনি আবেদন করতে পারবেন এবং আবেদনের বর্তমান অবস্থা (Status) চেক করতে পারবেন।
- অনলাইন আবেদন ও স্ট্যাটাস চেক লিংক: tcbsheba.com – সরাসরি আপনার এনআইডি (NID) নম্বর দিয়ে আবেদনের অবস্থা জানতে এই লিংকটি ব্যবহার করুন।
- স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড মোবাইল অ্যাপ: TCB Smart Family Card Sheba (Google Play Store) – কার্ড অ্যাক্টিভেশন এবং তথ্য যাচাইয়ের জন্য এই অ্যাপটি ব্যবহার করা হয়।
- টেলিটক আবেদন পোর্টাল: tcb.teletalk.com.bd – অনেক সময় বিশেষ নিয়োগ বা নির্দিষ্ট সার্কুলারের ক্ষেত্রে এই পোর্টালটি ব্যবহার করা হয়।
আমি কি দুইবার আবেদন করতে পারব?
না, একজনের নামে বা একটি এনআইডি দিয়ে একবারই আবেদন করা সম্ভব। ডুপ্লিকেট আবেদন করলে দুটিই বাতিল হতে পারে।
ফ্যামিলি কার্ড করতে কত টাকা লাগে?
সরকারিভাবে ফ্যামিলি কার্ডের আবেদনের জন্য কোনো টাকা লাগে না। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।
কার্ড হারিয়ে গেলে কী করব?
প্রথমে নিকটস্থ থানায় একটি জিডি করুন। এরপর জিডি কপির ফটোকপি নিয়ে আপনার ইউনিয়ন পরিষদ বা কাউন্সিলর অফিসে নতুন কার্ডের জন্য আবেদন করুন।
ভাড়াটিয়ারা কি বর্তমান ঠিকানায় আবেদন করতে পারবেন?
হ্যাঁ, ভাড়াটিয়ারা তাদের বর্তমান ঠিকানার বিদ্যুৎ বিলের কপি বা বাড়িওয়ালার প্রত্যয়নপত্র জমা দিয়ে আবেদন করতে পারেন।
অবিবাহিতরা কি এই কার্ড পেতে পারেন?
ফ্যামিলি কার্ড মূলত একটি পরিবারের জন্য। তবে কেউ যদি একা বসবাস করেন এবং তার আলাদা খানা (Household) থাকে, তবে তিনি আবেদন করতে পারেন।
কার্ড দিয়ে মাসে কয়বার পণ্য নেওয়া যায়?
সাধারণত মাসে একবার পণ্য সরবরাহ করা হয়। তবে বিশেষ উৎসব যেমন রমজান বা ঈদে সরকার অতিরিক্ত পণ্য দিতে পারে।
বিদেশ ফেরতরা কি এই সুবিধা পাবেন?
যদি আবেদনকারী বর্তমানে বেকার থাকেন এবং তার আয়ের কোনো উৎস না থাকে, তবে তিনি নিয়ম মেনে আবেদন করতে পারবেন।
উপসংহার
ফ্যামিলি কার্ড বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে দরিদ্র মানুষের জন্য একটি আশীর্বাদ। ২০২৬ সালের এই নতুন ডিজিটাল আবেদন পদ্ধতি সাধারণ মানুষের জন্য সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে কোনো দালালের সাহায্য ছাড়াই নিজের অধিকার বুঝে নেওয়ার। আপনি যদি এই পোস্টের নির্দেশিকাগুলো মেনে সঠিকভাবে আবেদন করেন, তবে আশা করা যায় খুব দ্রুতই আপনি আপনার ফ্যামিলি কার্ডটি হাতে পাবেন। দেশের উন্নয়নে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সবসময় সঠিক তথ্য দিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করুন।




