আজকের স্বর্ণের দাম কত বাংলাদেশে – ২২ ক্যারেট ও ২৪ ক্যারেট সোনার সর্বশেষ রেট আজ
স্বর্ণ কেবল একটি অলংকার নয়, এটি একটি আপদকালীন সম্পদ। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে স্বর্ণের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে বিয়ের মৌসুমে স্বর্ণের চাহিদা যেমন বাড়ে, তেমনি বিনিয়োগকারী হিসেবে সাধারণ মানুষও এই ধাতুর ওপর ভরসা রাখে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণের বাজার যে অস্থিরতা পার করছে, তা আগে কখনো দেখা যায়নি। ২০২৬ সালের শুরুর দিকেই আমরা দেখছি স্বর্ণের দাম আকাশছোঁয়া। আজকের এই নিবন্ধে আমরা ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর সম্ভাব্য রেট এবং স্বর্ণের বাজারের গভীর বিশ্লেষণ নিয়ে আলোচনা করব।
বর্তমানে বাংলাদেশে স্বর্ণের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বাজুস (BAJUS)। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতি আউন্স সোনার দাম এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান বিবেচনা করে তারা প্রায়শই সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করে। এবারের দাম বৃদ্ধিতে গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়েছে। কেন এই দাম বাড়ছে এবং সাধারণ ক্রেতাদের জন্য এই মুহূর্তে সোনা কেনা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব।
স্বর্ণের ক্যারেট হলো এর বিশুদ্ধতার পরিমাপক। ২৪ ক্যারেট সোনা হলো বিশুদ্ধতম রূপ, যা মূলত বার হিসেবে থাকে। অন্যদিকে ২২ ক্যারেট সোনা দিয়ে অলংকার তৈরি করা হয় কারণ এতে সামান্য খাদ মিশ্রিত থাকে যাতে গয়না টেকসই হয়। ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সোনার বাজার এখন আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। নিচে একটি বিস্তারিত টেবিলের মাধ্যমে বর্তমান রেট তুলে ধরা হলো।
স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশ্ববাজারের উচ্চ চাহিদা এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ঘাটতি। বাংলাদেশের বাজারে সাধারণত আন্তর্জাতিক দামের সাথে ৩-৫ হাজার টাকার একটি ব্যবধান থাকে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ব্যবধান অনেকটাই কমে এসেছে। সোনা কেনার আগে আজকের এই রেটগুলো দেখে নেওয়া আপনার আর্থিক পরিকল্পনার জন্য সহায়ক হবে।
বাংলাদেশের আজকের স্বর্ণের বাজার দরের তালিকা (১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ – আনুমানিক)
| স্বর্ণের ধরন ও ক্যারেট | প্রতি ভরির দাম (টাকা) | প্রতি গ্রামের দাম (টাকা) | বিশুদ্ধতা ও মান |
| ২২ ক্যারেট (Hallmark) | ৳ ২,৫৯,৬৯৯ | ৳ ২২,২৬৫ | ৯১.৬% উচ্চ মান |
| ২১ ক্যারেট (Hallmark) | ৳ ২,৪৭,৯১৮ | ৳ ২১,২৫৫ | ৮৭.৫% টেকসই |
| ১৮ ক্যারেট (Hallmark) | ৳ ২,১২,৫১৮ | ৳ ১৮,২২০ | ৭৫.০% স্টাইলিশ |
| সনাতন পদ্ধতি/পুরানো সোনা | ৳ ১,৭৩,৯১০ | ৳ ১৪,৯১০ | বৈচিত্র্যময় মান |
(দ্রষ্টব্য: এই দামের সাথে সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত নুন্যতম মেকিং চার্জ বা মজুরি যুক্ত হবে। দোকানভেদে মজুরি ১,০০০ টাকা থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।)
২২ ক্যারেট ও ২৪ ক্যারেট সোনার পার্থক্যের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
স্বর্ণ কেনার ক্ষেত্রে সব থেকে বড় বিভ্রান্তি তৈরি হয় ক্যারেট নিয়ে। ২৪ ক্যারেট সোনা হলো ৯৯.৯ শতাংশ বিশুদ্ধ। এটি সাধারণত কয়েন বা বার আকারে পাওয়া যায়। আপনি যদি স্বর্ণকে কেবল একটি বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে দেখেন, তবে ২৪ ক্যারেট কেনা সবচেয়ে লাভজনক। কারণ এতে কোনো খাদ থাকে না এবং পুনঃবিক্রয় মূল্য অনেক বেশি পাওয়া যায়। তবে এটি নরম হওয়ায় গয়না তৈরির জন্য উপযুক্ত নয়।
অন্যদিকে, ২২ ক্যারেট সোনা দিয়ে অলংকার তৈরি করা হয়। এতে ৯১.৬ শতাংশ বিশুদ্ধ সোনা থাকে এবং বাকি অংশ তামা, রূপা বা জিংক দিয়ে পূর্ণ করা হয়। এর ফলে সোনা শক্ত হয় এবং গয়নার সূক্ষ্ম কাজগুলো টেকসই হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে যে দাম দেখা যাচ্ছে, তাতে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি ভরির দাম ২ লক্ষ ৫৯ হাজার টাকার উপরে। এই উচ্চ মূল্যের কারণে ক্রেতারা এখন হীরা বা ১৮ ক্যারেটের
হালকা গয়নার দিকেও ঝুঁকছেন।
কেন ২০২৬ সালে স্বর্ণের দাম এত বাড়ল?
২০২৬ সালের শুরুতেই স্বর্ণের দাম আড়াই লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার পেছনে একাধিক বৈশ্বিক এবং দেশীয় কারণ রয়েছে। বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের রিজার্ভ হিসেবে স্বর্ণের মজুদ বাড়াচ্ছে। যখনই বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দেয়, বড় বড় দেশগুলো ডলারের পরিবর্তে স্বর্ণের দিকে হাত বাড়ায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম কয়েক হাজার ডলারে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশে ডলারের বিনিময় হার একটি বিশাল ভূমিকা পালন করে। যেহেতু আমাদের দেশে চাহিদার অধিকাংশ সোনা আমদানি করতে হয়, তাই ডলারের দাম বাড়লে সরাসরি সোনার দামে এর প্রভাব পড়ে। এছাড়া মুদ্রাস্ফীতির কারণে বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে স্বর্ণে বিনিয়োগ করছেন, যা চাহিদাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সরবরাহ কম এবং চাহিদা বেশি হওয়ায় বাজার এখন ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
হলমার্ক করা সোনা কেনার গুরুত্ব ও সচেতনতা
আগেকার দিনে সোনা কেনার সময় গ্রাহকরা প্রতারিত হতেন কারণ বিশুদ্ধতা যাচাই করার কোনো আধুনিক উপায় ছিল না। তবে এখন বাজুস অনুমোদিত প্রতিটি দোকানে হলমার্ক করা সোনা বাধ্যতামূলক। হলমার্ক মানে হলো সোনার গয়নার ভেতরে একটি বিশেষ লেজার খোদাই করা থাকবে, যা বিএসটিআই স্বীকৃত ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার পর দেওয়া হয়।
আপনার কেনা গয়নাটি ২২ ক্যারেট না কি ২১ ক্যারেট, তা হলমার্ক চিহ্নের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া যায়। ২ লক্ষ ৫৯ হাজার টাকা খরচ করে এক ভরি সোনা কেনার সময় যদি আপনি হলমার্ক ছাড়া কিনেন, তবে বিক্রির সময় আপনি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন। কারণ হলমার্ক বিহীন সোনা অনেক সময় অসাধু ব্যবসায়ীরা নিম্নমানের খাত মিশিয়ে বিক্রি করে। তাই সর্বদা রশিদ এবং হলমার্ক দেখে পণ্য গ্রহণ করুন।
স্বর্ণে বিনিয়োগ করার সঠিক সময় কোনটি?
স্বর্ণের দাম যখন এত চড়া, তখন অনেকেই প্রশ্ন করেন যে এখন সোনা কেনা কি ঠিক হবে? ইতিহাস বলছে, স্বর্ণের দাম দীর্ঘমেয়াদে কখনোই কমে না। আপনি যদি ৫ বা ১০ বছরের জন্য চিন্তা করেন, তবে বর্তমানের ২ লক্ষ ৬০ হাজার টাকার সোনা ভবিষ্যতে আরও অনেক বেশি মূল্যে বিক্রি করা সম্ভব হবে। তবে স্বল্পমেয়াদী লাভের আশায় এখন সোনা কেনা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
আপনি যদি বিয়ের জন্য সোনা কিনতে চান, তবে দাম কমার অপেক্ষায় না থেকে অল্প অল্প করে কেনা শুরু করতে পারেন। কারণ বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অদূর ভবিষ্যতে দাম নাটকীয়ভাবে কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, ২০২৬ সাল জুড়ে স্বর্ণের বাজার স্থিতিশীল হওয়ার বদলে আরও উর্ধ্বমুখী হতে পারে। তাই আপনার সাধ্য অনুযায়ী বিনিয়োগ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
সোনার গয়না রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা
স্বর্ণ অত্যন্ত দামী ধাতু হওয়ায় এর নিরাপত্তা একটি বড় চিন্তার বিষয়। এত দাম দিয়ে সোনা কেনার পর তা বাড়িতে রাখা এখন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অনেক ব্যাংক এখন গোল্ড লকার সুবিধা দেয়, যা আপনি বার্ষিক চার্জের বিনিময়ে ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া বাড়িতে সোনা রাখলে ডিজিটাল লকার বা ভল্ট ব্যবহার করা নিরাপদ।
গয়নার উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে মাঝে মাঝে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। তবে সাবান পানি বা কেমিক্যাল ব্যবহারের আগে সতর্ক থাকুন। হালকা কুসুম গরম পানিতে মাইল্ড ডিটারজেন্ট দিয়ে নরম ব্রাশের সাহায্যে আলতো করে পরিষ্কার করলে সোনার উজ্জ্বলতা বজায় থাকে। তবে সব থেকে ভালো হয় বছরে একবার প্রফেশনাল জুয়েলারি দোকান থেকে পলিশ করিয়ে নেওয়া।
উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, আজকের বাংলাদেশের বাজারে স্বর্ণের দাম একটি ঐতিহাসিক উচ্চতায় রয়েছে। ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ২ লক্ষ ৫৯ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া আমাদের অর্থনীতির এক নতুন বাস্তবতা নির্দেশ করছে। ক্রেতা হিসেবে আমাদের এখন আরও বেশি সচেতন হতে হবে। কেবল শখের বসে নয়, আর্থিক নিরাপত্তার কথা ভেবে স্বর্ণ কেনা উচিত। আশা করি এই নিবন্ধটি আপনাদের আজকের সোনার বাজার এবং ক্যারেট সংক্রান্ত সব তথ্য পেতে সাহায্য করেছে। সবসময় আপডেট থাকতে বাজুসের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের দিকে নজর রাখুন।
FAQs
বর্তমানে বাংলাদেশে ১ ভরি ২২ ক্যারেট সোনার দাম কত?
১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, ১ ভরি ২২ ক্যারেট সোনার বাজার মূল্য আনুমানিক ২,৫৯,৬৯৯ টাকা। এর সাথে মজুরি ও ভ্যাট আলাদাভাবে যোগ হবে।
২১ ক্যারেট ও ১৮ ক্যারেট সোনার মূল পার্থক্য কী?
২১ ক্যারেটে ৮৭.৫% বিশুদ্ধ সোনা থাকে, যা সাধারণত প্রচলিত গয়নার জন্য ব্যবহৃত হয়। ১৮ ক্যারেটে ৭৫% সোনা থাকে এবং এটি ডায়মন্ড সেটিং বা আধুনিক ডিজাইনের গয়নার জন্য বেশি উপযোগী।
১ ভরি সোনা সমান কত গ্রাম?
বাংলাদেশে ১ ভরি বলতে ১১.৬৬৪ গ্রাম বোঝানো হয়।
পুরোনো সোনা বিক্রি করলে কি বর্তমান বাজার দাম পাওয়া যায়?
সাধারণত পুরোনো সোনা বিক্রি করার সময় বর্তমান বিক্রয় মূল্যের চেয়ে ২০% থেকে ২৫% কম দাম দেওয়া হয়। বাজুস নির্ধারিত বিক্রয় ও ক্রয় মূল্যের মধ্যে পার্থক্য থাকে।
হলমার্ক ছাড়া সোনা কেনা কি ঝুঁকিপূর্ণ?
হ্যাঁ, হলমার্ক ছাড়া সোনা কিনলে তার বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা যায় না। পরবর্তীতে অন্য দোকানে বিক্রি করতে গেলে ন্যায্য দাম না পাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সনাতন পদ্ধতির সোনা বলতে কী বোঝায়?
সনাতন পদ্ধতির সোনা হলো এমন সোনা যার ক্যারেট বা বিশুদ্ধতা বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাইকৃত নয় এবং যা পুরোনো পদ্ধতিতে তৈরি। এ ধরনের সোনার দাম ক্যারেট সোনার তুলনায় কম হয়।
স্বর্ণের দামে ভ্যাট কত শতাংশ দিতে হয়?
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশে জুয়েলারি পণ্য কেনার সময় মূল দামের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট প্রদান করতে হয়।

